সরওয়ার আজম মানিক:
৯৫ বছর বয়সী লাথামো রাখাইন। কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের মধ্যম রাখাইন পাড়ার প্রবীণ এই নারী জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটিয়েছেন সুপেয় পানির জন্য সংগ্রাম করে। বিয়ের পর এ গ্রামে আসার পর থেকে প্রতিদিন দূরের একটি পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো তাকে। সেই পুকুরের পানি দিয়েই চলত রান্না, খাওয়া, কাপড় ধোয়া, গোসল—সবকিছু। বর্ষাকালে পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে যেত, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত পানির তীব্র সংকট।
আজ সেই লাথামো রাখাইনের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে শুনতে হয় এক ভিন্ন গল্প। এখন আর পুকুরে যেতে হয় না। সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাইপলাইনের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে বিশুদ্ধ পানি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নারী আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, “আমার জীবনে এমন দিনও আসবে, কখনও ভাবিনি। এখন ঘরে বসেই পানি পাই।”
লাথামো রাখাইনের গল্প শুধু একজন মানুষের গল্প নয়। এটি কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবন বদলে যাওয়ার গল্প। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের কারণে যখন কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় সুপেয় পানির সংকট দিন দিন তীব্র হয়ে উঠছে, তখন নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করে মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে হাইসাওয়া বাংলাদেশ (হাইজিন, স্যানিটেশন অ্যান্ড ওয়াটার সাপ্লাই)।
ডেনমার্ক সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘ইনক্লুসিভ ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন ফর রেজিলিয়েন্ট হোস্ট কমিউনিটিজ (আইসিএআর)’ প্রকল্পের মাধ্যমে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন এবং টেকনাফ পৌরসভার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রাখাইন সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রথম আঘাত পানিতে
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জেলা কক্সবাজার। দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। অনেক এলাকায় অগভীর নলকূপে আর সুপেয় পানি পাওয়া যায় না। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে পুকুর, খাল কিংবা দূষিত পানির উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সমুদ্রতীরবর্তী রাখাইন অধ্যুষিত এলাকা, জেলে পল্লি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসতিগুলোতে। বছরের পর বছর এসব এলাকার নারী ও শিশুদের পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
---
রাখাইন পাড়ার জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া
চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত মধ্যম রাখাইন পাড়া। একসময় এই পাড়ার মানুষের দিন শুরু হতো পানির খোঁজে। নিরাপদ পানির কোনো স্থায়ী উৎস ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দা মাছা রাখাইন বলেন, “আগে দিনের অনেকটা সময় শুধু পানির জন্য ব্যয় হতো। এখন বাড়িতেই বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি। জীবন অনেক সহজ হয়ে গেছে।”
সায় মং রাখাইন বলেন, “আগে পানি আনতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হতো। এখন সেই কষ্ট নেই। আমাদের সন্তানরাও নিরাপদ পানি পাচ্ছে।”
খিন খিন রাখাইন জানান, বিশুদ্ধ পানি পাওয়ার কারণে পরিবারে পানিবাহিত রোগের প্রকোপও কমেছে।
ছেমারি রাখাইন বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাইপলাইনের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি পানি পৌঁছে যাচ্ছে। পরিবেশের কোনো ক্ষতিও হচ্ছে না। আগের তুলনায় এখন বাচ্চাদের অসুস্থতাও কম।”
বুবু রাখাইনের ভাষায়, “আগে যখন পানি দরকার হতো, তখন চিন্তা করতে হতো কোথা থেকে আনব। এখন যখন ইচ্ছা, তখনই পানি ব্যবহার করতে পারি।”
চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাবু উছা ছিং রাখাইন বলেন, “আমাদের চারটি রাখাইন পাড়ার বাসিন্দা এখন এই প্রকল্পের সুফল পাচ্ছেন। মানুষের মুখে হাসি ফিরেছে।”

---
নারীদের কাঁধ থেকে নেমেছে পানির বোঝা
পানি সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিলেন নারীরা। পরিবারের জন্য পানি সংগ্রহের দায়িত্ব মূলত তাদেরই বহন করতে হতো।
চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম বলেন, “দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হতো। কখনও দিনে তিন-চারবারও যেতে হয়েছে। এখন ঘরে বসেই পানি পাচ্ছি। আমাদের কষ্টের কথা বলে বোঝানো যাবে না।”
তিনি বলেন, আগে পানি সংগ্রহেই দিনের অনেক সময় চলে যেত। এখন সেই সময় সন্তানদের পড়াশোনা, গৃহস্থালি কাজ কিংবা আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে নারীদের জীবনমান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

---
পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেছে নিরাপদ পানির ধারা
কক্সবাজার সদর উপজেলার ভারুয়াখালী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়ি এলাকায়ও পৌঁছে গেছে এই উদ্যোগের সুফল।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাকিমের বাড়ির উঠোনে স্থাপন করা হয়েছে একটি গভীর নলকূপ। এখান থেকে উত্তোলিত পানিতে আয়রনের উপস্থিতি থাকায় বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে আশপাশের ৩৫টি পরিবারের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে।
আব্দুল হাকিমের স্ত্রী বলেন, “আমার উঠোন থেকে আশপাশের বাড়িগুলোতে পানি যাচ্ছে। মানুষ উপকার পাচ্ছে। এতে আমি খুব আনন্দিত। আগে এখানে পানির জন্য অনেক কষ্ট ছিল।”

---
শুধু পানি নয়, বদলাচ্ছে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি
নিরাপদ পানির অভাবে উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ডায়রিয়া, আমাশয়, চর্মরোগ, জন্ডিসসহ নানা রোগের প্রকোপ ছিল।
স্থানীয়রা জানান, বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের ফলে শিশুদের অসুস্থতা কমেছে। পরিবারের স্বাস্থ্য ব্যয়ও কমে এসেছে।
হাইসাওয়ার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপদ পানি সরবরাহের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি সংরক্ষণ, খাদ্য স্বাস্থ্যবিধি, ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

---
স্থানীয় সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্ব
হাইসাওয়ার অন্যতম শক্তি হলো ইউনিয়ন পরিষদকে সম্পৃক্ত করে কাজ করা।
রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের নারী চেয়ারম্যান খোদেস্তা বেগম রিনা বলেন, “হাইসাওয়া শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করে চলে যায় না। তারা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে এবং স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে। ফলে প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ায় জনগণের অংশগ্রহণও বেড়েছে।

---
এক লাখের বেশি মানুষের জীবনে পরিবর্তন
বর্তমানে আইসিএআর প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ ও রামু উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন এবং টেকনাফ পৌরসভায় ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে—
৪০০টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
৯৩টি সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম নির্মাণ করা হয়েছে।
১,৫৮৫টি পরিবারভিত্তিক উন্নত ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে।
এক লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধি সেবার আওতায় আনা হয়েছে।
হাইসাওয়ার কর্মকর্তারা জানান, সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাইপ ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমগুলো বিশেষভাবে কার্যকর। একটি প্ল্যান্টের মাধ্যমে ৩০ থেকে ৬০টি পরিবারকে নিরাপদ পানির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে।
---
জলবায়ু অভিযোজনের মডেল হিসেবে হাইসাওয়া
হাইসাওয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল ওসমান বলেন, “সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব বেশি হওয়ায় নিরাপদ পানির সংকট দীর্ঘদিনের। ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত পানির উৎসগুলোর বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।”
তিনি বলেন, “শুধু পানির উৎস স্থাপন নয়, আমরা জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ করছি। উঁচু প্ল্যাটফর্মে নলকূপ ও ল্যাট্রিন স্থাপন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসারে কাজ করছি।”
তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
---
দুই দশকের অভিজ্ঞতায় দেশজুড়ে সাফল্য
২০০৮ সাল থেকে হাইসাওয়া দেশের গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি খাতে কাজ করে যাচ্ছে।
এ পর্যন্ত সংস্থাটি—
দেশের ২৭টি জেলায় কাজ করেছে।
১,১০০টির বেশি ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
১ কোটির বেশি মানুষকে ওয়াশ সেবা দিয়েছে।
৮৪ হাজারের বেশি পানির উৎস স্থাপন করেছে।
১৭ লাখের বেশি স্যানিটারি ল্যাট্রিন নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।
সংস্থাটি প্রতিটি নলকূপের জন্য দুজন করে কেয়ারটেকার প্রশিক্ষণ দেয় এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। ফলে স্থানীয়ভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয়।
---
পানি থেকে মর্যাদা, স্বাস্থ্য থেকে উন্নয়ন
বিশুদ্ধ পানি শুধু একটি মৌলিক চাহিদা নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় হাইসাওয়ার উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। যেখানে একসময় মানুষ পানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করত, সেখানে এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে নিরাপদ পানি। শিশুদের স্বাস্থ্য ভালো হচ্ছে, নারীদের কষ্ট কমছে, মানুষ সময় পাচ্ছে উৎপাদনশীল কাজে অংশ নেওয়ার।
সবচেয়ে বড় কথা, জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও উপকূলের মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে।
লাথামো রাখাইনের মতো প্রবীণদের চোখে সেই পরিবর্তনের আনন্দ স্পষ্ট। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শুধু একটি কথাই বলেন—“আগে পানি ছিল কষ্টের নাম, এখন পানি আমাদের স্বস্তির নাম।”
কক্সবাজারের উপকূলীয় জনপদে এই পরিবর্তন প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং জলবায়ু-সহনশীল উদ্যোগ থাকলে প্রতিকূলতাকেও জয় করা সম্ভব। নিরাপদ পানির প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে তাই বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন, বদলে যাচ্ছে উপকূলের ভবিষ্যৎ।