শিরোনাম :
উখিয়ার বালুখালীতে অস্ত্র-মাদক ও সন্ত্রাসের অভিযোগ :আতঙ্কে স্থানীয়রা: অভিযানের দাবী কিশোরীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণ যুক্তির লড়াইয়ে মুখর কুতুবদিয়া দ্বীপ চ্যানেল ওয়ানের কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ পেলেন এফ এম সুমন উখিয়ায় সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু গবেষণা-ভিত্তিক আচরণ পরিবর্তনে প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগের কর্মশালা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক কার্যক্রম পরিদর্শনে বিডিআরসিএস চেয়ারম্যান সাবেক র‍্যাব কর্মকর্তার অপরাধকর্মের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দেওয়ায় সাংবাদিককে হুমকি কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আতাহার ইকবালের ইন্তেকাল : বিভিন্ন মহলের শোক টানা বৃষ্টিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ জেলায় সবজির বাজারে অস্থিরতা

উখিয়ার বালুখালীতে অস্ত্র-মাদক ও সন্ত্রাসের অভিযোগ :আতঙ্কে স্থানীয়রা: অভিযানের দাবী

নিউজ রুম / ২ বার পড়ছে
আপলোড : রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:২৮ অপরাহ্ন

বিডি প্রতিবেদক :

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী এলাকায় অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি ও অপহরণসহ নানা অপরাধের অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বালুখালী খেলার মাঠসংলগ্ন কালভার্ট, কবরস্থান ও নির্জন এলাকায় সশস্ত্র অবস্থান নিয়ে পথচারী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বালুখালীর আজিজুল হক ওরফে ‘জুলু ডাকাতের’ ছেলে নূরুল আমিন। তার সঙ্গে তার ভাই বাবুল, জানে আলম, পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং নূরুল সওদাগরসহ আরও কয়েকজনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

অস্ত্র-গোলাবারুদসহ নূরুল আমিন আটক

চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি বালুখালীর রহমতের বিল এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযান। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ওই অভিযানে নূরুল আমিন (৩২), জানে আলম (৩৫) ও সোহেল রানা (২৬) নামে তিনজনকে আটক করা হয়। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নূরুল আমিন উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী গ্রামের বাসিন্দা ও আজিজুল হকের ছেলে।

অভিযানে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি একে-২২ রাইফেল, একটি দেশীয় পিস্তল, দুটি একনলা বন্দুক, দুটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র, একটি পিস্তলের ম্যাগাজিন, দুটি রাইফেলের ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৮৯ রাউন্ড রাইফেলের গুলি, দুটি কার্তুজ এবং দুটি ওয়াকিটকি সেট উদ্ধারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ সময় একটি মোটরসাইকেলও জব্দ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

উখিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নুর আহমদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আটক ব্যক্তিদের থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নূরুল আমিন এর আগেও মাদকসংক্রান্ত মামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন।

রাতে খেলার মাঠসংলগ্ন এলাকায় ‘ফাঁদ’

বালুখালী এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, সন্ধ্যার পর খেলার মাঠসংলগ্ন কালভার্ট ও কবরস্থান এলাকার নির্জন অংশগুলোতে সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা অবস্থান নেয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ রাতে বাড়ি ফেরার সময় এসব স্থানে ছিনতাইয়ের শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস অনেকের নেই। অভিযোগ করলে হামলা বা প্রতিশোধের আশঙ্কা থাকে বলেও তারা দাবি করেন।

তাদের আরও অভিযোগ, চক্রটির প্রভাবের কারণে অনেক ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা পরবর্তীতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পান। কেউ কেউ বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্ত্র ও অপরাধের অভিযোগ

বালুখালী ও আশপাশের রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধী চক্রগুলোর সঙ্গে স্থানীয় অপরাধীদের যোগাযোগ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। গত ৩ মার্চ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির-৯-এর সি/১৮ ব্লকসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ পাঁচজন রোহিঙ্গাকে আটকের দাবি করেছে র‍্যাব-১৫। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, ওই ঘটনায় নূরুল আমিনের বড় ভাই বাবুলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও তিনি অভিযানের সময় পালিয়ে যান।

এ ছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় বালুখালী ও আশপাশের ক্যাম্পগুলোতে মাদক পাচার, অস্ত্রের ব্যবহার এবং অপহরণ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্প থেকে অস্ত্রসহ সন্ত্রাসী এবং অপহরণকারী আটকের ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

গুলিবিনিময় ও রোহিঙ্গা যুবক আহতের অভিযোগ

স্থানীয়দের দাবি, ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর রোহিঙ্গা মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে নূরুল আমিনের পক্ষের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে জুবায়ের নামের এক রোহিঙ্গা যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের আরও দাবি, ওই ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার পর জুবায়েরকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর এবং অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে আশ্রয়ের অভিযোগ

অন্যদিকে, নূরুল আমিনের আত্মীয় নূরুল সওদাগরের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী শিবিরের বাইরে অবৈধভাবে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, বালুখালী সেনা ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় সরকারি খাস জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং বাড়ির আশপাশে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, এসব অস্থায়ী স্থাপনায় থাকা কয়েকজন রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে সেখানে বর্তমানে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা বসবাস করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে কি না, তা প্রশাসনিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

উচ্ছেদ অভিযানে জরিমানা

সেনা ক্যাম্পের আশপাশে শরণার্থী শিবিরের বাইরে রোহিঙ্গাদের অনিয়ন্ত্রিত বসবাসকে নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ কারণে গত ৮ ফেব্রুয়ারি যৌথবাহিনীর নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পের বাইরে বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে তাদের নিবন্ধিত শিবিরে ফেরত পাঠানোর কথা স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

অভিযানের সময় রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে নূরুল সওদাগরকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

আবারও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের পরও নূরুল সওদাগরের বাড়িতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তাদের আরও অভিযোগ, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের বসবাসের সুযোগ দেওয়া হলে একদিকে যেমন মাদক ও মানবপাচারসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে, অন্যদিকে সেনা ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

স্থানীয়দের দাবি কঠোর নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বালুখালীতে অস্ত্র, মাদক, ছিনতাই, অপহরণ এবং অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগগুলো আলাদাভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা, অস্ত্র উদ্ধার বা অপরাধের প্রমাণ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে আইনের বাইরে রাখা হলে অপরাধী চক্র আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি না করে প্রত্যেকটি অভিযোগ তদন্ত, মামলা ও আদালতের নথির মাধ্যমে যাচাই করাও জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বালুখালী সীমান্তবর্তী এবং রোহিঙ্গা শিবিরসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হওয়ায় এখানে অস্ত্র ও মাদকের বিস্তার শুধু স্থানীয় জননিরাপত্তার জন্য নয়, বৃহত্তর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যও উদ্বেগের। তাই নিয়মিত যৌথ অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান এবং ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবৈধ বসবাস বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি চান তারা।

তবে বালুখালীর নূরুল আমিন, আজিজুল হক ও নূরুল সওদাগরের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেয়ার জন্য একাধিক বার মোবাইলে ফোন দেয়ার পরও সংযোগ না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।


আরো বিভিন্ন বিভাগের খবর