সাকলাইন আলিফ :
আজ ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য “সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত”। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বাস্তুচ্যুত ও আশ্রয়হীন মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে দিবসটি পালন করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য দিবসটি এসেছে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং নিজভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
তবে এখনো অনিশ্চিত তাদের নিজ দেশে ফেরার ভবিষ্যৎ। নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে ফিরতে চায় রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা সংকট অর্থায়ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান ঘোষণা করেছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে প্রত্যাবাসন অনুকূলে নয়। কিন্তু প্রত্যাবাসন এই একমাত্র সমাধানের পথ। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে। আজ সরকারি বন্ধের দিন হওয়ায় শরণার্থী দিবস নিয়ে কোন আয়োজন থাকছে না রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে। তবে ২১ জুন উখিয়ার চার নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে একটি ফুটবল খেলার আয়োজন রয়েছে।
বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে যত রাষ্ট্রহীন মানুষ রয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশই রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন, বৈষম্য ও সহিংসতার শিকার হয়ে পালিয়ে আসা এসব মানুষের জন্য বাংলাদেশ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।
২০১৭ সালের আগস্টের প্রথম দিকে মিয়ানমারের জন্তা সরকার রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন শুরু করে। তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে নিরীহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কে হত্যা করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে ২৫ আগস্ট লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। মাত্র এক মাসে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরও দেড় লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শরণার্থী ক্যাম্পে বসবাস করছে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা।ফলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনপদের ভার বহন করছে বাংলাদেশ।
বিশ্বের রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশই রোহিঙ্গা। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বহীন এই জনগোষ্ঠী এখনো নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায়।
ক্যাম্পে বসবাসরত রোহিঙ্গারা বলছেন, তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত।
কক্সবাজারের উখিয়ার রেজিস্টার্ড ক্যাম্পের শরণার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেক পুরানো, আমার জন্ম এখানে। কিন্তু এখনো নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। আশা করবো বর্তমান বাংলাদেশের সরকার আমাদের সেই আশা পূরণ করবে।
এক নম্বর ইস্ট ক্যাম্পে বসবাসকারী মিয়ানমারের আকিয়াব এলাকার বাসিন্দা মাওলানা দলিলুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। আমরা অবশ্যই আমাদের দেশে ফিরে যেতে চাই। সরকারের কাছে আমাদের দাবি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ প্রয়োগ করে আমাদের যেন নিজের দেশে ফিরে যেতে সহযোগিতা করেন।
চার নাম্বার ক্যাম্পে বসবাসকারী মিয়ানমারের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশকে অনেক ধন্যবাদ, তারা আমাদের জন্য অনেক কিছু করেছে। কিছু রোহিঙ্গা দুষ্কৃতীর কারণে, আমাদের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর দিনদিন স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে, আমরা চেষ্টা করছি আমাদের জনগোষ্ঠীর মানুষদের এ ব্যাপারে সচেতন করতে।
উখিয়ার মধুর ছড়া ক্যাম্পে বসবাসকারী মিয়ানমারের নাগরিক হাফেজ মাওলানা আব্দুস সালাম বলেন, প্রতিদিন আমরা মসজিদে আমাদের রোহিঙ্গাদের তরুণরা যেন সচেতন হয়, ধর্মের দিকে খেয়াল করে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে, সেই ব্যাপারে আমরা তালিম দিয়ে থাকি।
২১ নম্বর ক্যাম্পে বসবাসকারী মিয়ানমারের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ২০১৭ সালে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে এসেছিলাম পরিবারের ১২ সদস্য। এখন আমাদের এখানে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে। তারপরও আমরা নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই।
একই ক্যাম্পের বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, আমরা অবশ্যই আমাদের দেশে ফিরে যাব। এখানে এসেছি মেহমান হিসেবে। আমাদের অনেক সম্পদ রয়েছে মিয়ানমারে। সেখানকার জমিদার ছিলাম আমি। আজ এখানে এসে মানবতার দিন কাটাতে হচ্ছে আমাকে। তবে আমরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই।
রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা ও আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস এন্ড হিউম্যান রাইটস এর সভাপতি মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন,আমরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চাই না। বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ আমাদের যে আশ্রয় দিয়েছে, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা নিজ দেশে ফিরে যেতে প্রস্তুত। তবে প্রত্যাবাসনের আগে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
অন্যদিকে, আশ্রয়দাতা এলাকার বাসিন্দারা দীর্ঘমেয়াদি এ সংকটের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কক্সবাজারের উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, “মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও আরাকান আর্মির সংঘাতের কারণে সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। তবে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে নানা চাপ তৈরি হয়েছে।”
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মো. মিজানুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা সংকট এখন একটি গুরুতর অর্থায়ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট—রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কাজ করে যাওয়া।”
তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় নয় বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। তারপরও সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।”
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি জানান, ২০১৮ সালে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় অনেক পরিবারে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছে, আবার অনেকে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে তথ্য যাচাই ও হালনাগাদের কাজ চলমান রয়েছে।
ক্যাম্পের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আরআরআরসি বলেন, “বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এদিকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান ঘোষণা করেছে। এই অর্থ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার বলেন, সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শনিবার গেম গুলোতে কোন আয়োজন থাকছে না। তবে ২১ জুন ৪ নাম্বার ক্যাম্পের ফুটবল মাঠে একটি বড় ফুটবল খেলার টুর্নামেন্ট রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, শরণার্থী দিবস উপলক্ষে যারা বিগত সময়ে এবং বর্তমানে এখনো বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তাদেরকে অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর প্রায় শেষ হতে চলেছে, আমাদের মূল টার্গেট হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের কে ন্যূনতম সেবা প্রদান করে এখানে রেখে, তাদেরকে তাদের দেশে সম্মানের সাথে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই নিরিখে আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত একজন ব্যক্তিকেও তাদের দেশে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র মিয়ানমার, যাদের নাগরিকরা আমাদের দেশে এসে অবস্থান করছে, সে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতি সেটি প্রত্যাবাসনের অনুকূল নয়। সেজন্যে আমরা মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করব তারা যাতে তাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি উন্নতি সাধন করে এবং আমাদের যে নতুন সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তাদের দলীয় নির্বাচনী ইশতেহারে রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে স্পষ্ট করে তারা বর্ণনা করেছেন। যে প্রত্যাবাসনই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এতগুলো মানুষকে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ বিশেষ করে কক্সবাজারের মত একটি অঞ্চল এভাবে বছরের পর বছর রেখে আইনশৃঙ্খলা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করা অসম্ভব। সেজন্য প্রত্যাশনই একমাত্র সমাধান। সেই লক্ষ্যে সবাইকে কাজ করতে হবে। সরকারও সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।
বিশ্ব শরণার্থী দিবসে আবারও সামনে এসেছে একটি প্রশ্ন—কতদিন চলবে এই অপেক্ষা? প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গা এখনো স্বদেশে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন দেখছে। আর বাংলাদেশ, সীমিত সম্পদ ও নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও মানবিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।