বিডি প্রতিবেদক (ভোলা, ৫ জুন) ॥
বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ভোলা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে কোস্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণে জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার মতো বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে নদী, খাল, বিল, পুকুর, জলাভূমিসহ প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম কার্যকর প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু অবৈধ দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে এসব জলাশয় দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বৃষ্টির পানি ধারণ ও সংরক্ষণের সক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
তারা আরও বলেন, কৃষি সেচ ও শিল্পকারখানায় গভীর নলকূপের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে পানির স্তর আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে অনেক নলকূপ অকার্যকর হয়ে পড়ছে এবং বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানীয় জলের সংকট তীব্রতর হচ্ছে।
বক্তারা দেশের সকল প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ, পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহার আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনঃস্থাপনের দাবি জানান। একই সঙ্গে নদী, খাল, জলাভূমি, সরকারি পুকুর ও অন্যান্য উন্মুক্ত জলাশয় সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুজ্জীবন এবং টেকসই ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মানববন্ধনে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, নারী নেত্রী, শিক্ষার্থী, যুব প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কোস্ট ফাউন্ডেশনের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রধান এম. এ. হাসান।
এ সময় বক্তব্য দেন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি নেয়ামত উল্লাহ, ভোলা জেলা কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. তাসলিম, নারী নেত্রী নূরজাহান নীলা, অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন সুলতান, দৈনিক বাংলাদেশ আলোর জেলা প্রতিনিধি হারুনুর রশিদ শিমুল, বিডি ক্লিনের সুমাইয়া আক্তার এবং কোস্ট ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের রাজীব ঘোষ।
এম. এ. হাসান বলেন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। অবৈধভাবে দখল হওয়া নদী, খাল ও পুকুর উদ্ধার এবং ভবিষ্যতে দখল রোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জলাশয় খনন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি ধারণ, নিরাপদ পানীয় জলের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে।
নেয়ামত উল্লাহ বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন উন্মুক্ত জলাশয় ধ্বংস ও ভরাটের অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, উপরিভাগের পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার না করা হলে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
‘আমরা ভোলা বাসী’-এর সদস্য সচিব মীর মোশাররফ হোসেন বলেন, নির্বিচারে গাছ কেটে স্থানীয় ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, এভাবে বন উজাড় চলতে থাকলে পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
হারুনুর রশিদ শিমুল বলেন, ভোলা শহরের বিভিন্ন খাল পর্যটন প্রকল্পের নামে দখল ও ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া অনেক সরকারি পুকুর ইতোমধ্যে দখলের শিকার হয়েছে এবং আরও অনেক জলাশয় হুমকির মুখে রয়েছে। তিনি এসব জলাশয় দ্রুত উদ্ধার ও সংরক্ষণের দাবি জানান।
নারী নেত্রী নূরজাহান নীলা বলেন, ইটভাটার দূষণের কারণে আশপাশের মানুষ শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, হৃদরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া ইট উৎপাদনে কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের ফলে জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।