পলাশ আহসান :
২০১৮ সালে বাংলাদেশের সম্প্রচার মাধ্যমের সব কর্মীর সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে গঠন হয়েছিল ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার বিজেসি। সংগঠন পরিচালনায় ছিলো একটি ট্রাস্টি বোর্ড এবং নির্বাহী পরিষদ । আর সাংগঠনিক কাঠামোতে সবার অভিভাবক হিসাবে একজন ন্যায়পাল রাখার বিধান করা হয়েছিল । বলা হয়েছিল, সংগঠনে যদি এমন কোন জটিল সমস্যা হয় যেটার সিদ্ধান্ত নেয়া যাচ্ছে না, সেসময় সিদ্ধান্ত দেবেন ন্যায়পাল। সেই ন্যায়পাল এমন একজন গ্রহণযোগ্য মানুষ হবেন যার সিদ্ধান্ত সবাই খুশিমনে মানতে পারেন। সেই বিবেচনায় বিজেসির প্রথম ন্যায়পাল মনোনীত হয়েছিলেন প্রয়াত শাহ আলমগীর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ছোট্ট গ্রাম জাফরপুর। নবীনগর উপজেলার এই গ্রামে ভূমিষ্ঠ হন শাহ আলমগীর। তারিখটা ইংরেজি ১৯৫৭ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি, বাংলা ১০ই ফাল্গুন ১৩৬৩। বাবা আবু ইউসুফ সরকার কাজ করতেন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে। বাবার চাকরির সুবাদে নেত্রকোণার দুর্গাপুরে কাটে শৈশব এবং কৈশোরের বেশিরভাগ সময়। একদিকে স্বচ্ছ সোমেশ্বরী অন্যদিকে বিজয়পুরে চীনে মাটির পাহাড়।
শাহ আলমগীরের প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শুরু হয়েছিল দুর্গাপুরের মহারাজা কুমুদচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে। লাইব্রেরি কেন্দ্রিক পড়াশোনা ও সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়েছিল ওই সময়। নবম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়েন। ১৯৬৯ এর শেষ দিকে বাবার চাকরির কারণে চলে আসেন ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। ১৯৭২ সালে গৌরীপুর আর কে হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে গৌরীপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৭৫ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। তিনি ১৯৮২ সালে অনার্সসহ স্নাতক এবং ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেন।

কলেজের প্রথমবর্ষেই তিনি জড়িয়ে পড়েন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে। অবশ্য এর আগে দুর্গাপুরে থাকতে বাম আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ কমরেড মনি সিংহ সম্পর্কে জেনেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ শাহ আলমগীরকে আচ্ছন্ন করেছিল সেই কিশোর বয়সেই। সেই মুগ্ধতার পথ ধরেই গৌরীপুর কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আরো সক্রিয় হন রাজনীতিতে । মুলত ওই সময়ই তাঁর মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম শুরু।
ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক থাকা অবস্থায় জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকতায়। শুরু করেন কিশোর বাংলা দিয়ে। এরপর দৈনিক জনতা, দৈনিক আজাদ, বাংলার বাণী, সংবাদ, চ্যানেল আই, একুশে টেলিভিশন, যমুনা টেলিভিশন, মাছরাঙা টেলিভিশন, এশিয়ান টেলিভিশনে কাজ করেন। শেষ পর্যন্ত কাজ করছিলেন প্রেস ইনিস্টিটিউট অব বাংলাদেশ এর মহাপরিচালক এবং সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে।

নিয়মিত চাকরির মধ্যে নিজের বার্তাকক্ষ তো বটেই দেশের অন্যান্য সাংবাদিকদের সুরক্ষা আদায়ের কথা কখনো ভোলেননি। ১৯৮৭ সালে দৈনিক আজাদে কাজ করতে করতেই ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্যপদ পান শাহ আলমগীর। ওই বছরেই শাহজাহান-আজাদ পরিষদে নির্বাহী সদস্য হিসাবে নির্বাচন করেন। এছাড়া তিনি বিএফইউজের যুগ্ম-মহাসচিব এবং ডিইউজ’র সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য । প্রেস ক্লাবের সব শেষ কাজ হিসাবে তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৩ সালের ৭ই জুলাই থেকে পিআইবির ডিরেক্টর জেনারেল হিসাবে কাজ শুরু করেন। আমৃত্যু এই প্রতিষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন তিনি। পিআইবির কর্মকর্তা কর্মচারিদের সুরক্ষায় পিআইবি আইন তৈরি তাঁর যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সারাদেশের সাংবাদিকদের জন্যে সরকার গঠিত বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ২০১৫ সালের ১৮ মে। পিআইবিতে থেকেই তিনি অবৈতনিক ভাবে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন । প্রথম এমডি হিসাবে তিনিই এই প্রতিষ্ঠানের একটা কাঠামো তৈরি করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা নিয়ে ফান্ড গঠন করে এই প্রতিষ্ঠান থেকে সাংবাদিকদের আর্থিক সহায়তা দেয়া শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। দেশের সব সম্প্রচার কর্মীদের সুরক্ষা দেয়ার সংগঠন বিজেসি’র ডাকে তাদের ন্যায়পাল মনোনীত হয়েছিলেন। এটিই ছিল তাঁর সব শেষ কোন সংগঠনে যুক্ত হওয়া।
২০১৭ থেকে একটু একটু অসুস্থ হচ্ছিলেন তিনি। দেশ বিদেশ মিলিয়ে চিকিৎসাও চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে একটা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান সিঙ্গাপুরে। দেশে বসেই সেই ফলাফল পান ২০শে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়। প্রথম বারের মত এটাই কোন একটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাগজ,যেখানে পরিস্কার ভাবে তাঁর রক্তের ক্যান্সার চিহ্নিত হয়। পরদিন সন্ধ্যায় ভর্তি হন সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।
কখনো খারাপ, কখনো একটু ভাল’র মধ্য দিয়ে কাটে আট দিন। ঠিক হয় ২৮শে ফেব্রয়ারি সকালে আসবেন সিঙ্গাপুরের দু’জন চিকিৎসক। কিন্তু সে সুযোগ তিনি দেননি কাউকে। ২৮শে ফেব্রয়ারি ২০১৯ এর সকাল ১০টার দিকে চিকিৎসকরা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিরেন সবার প্রিয় শাহ আলমগীর সব সুরক্ষার উর্ধে চলে গেছেন।

##পলাশ আহসান##
সহযোগী প্রধান বার্তা সম্পাদক
একাত্তর টেলিভিশন